ড. মোঃ কামরুজ্জামান
প্রথম কিস্তি
আফগানিস্তান অসংখ্য পাহাড়বেষ্টিত একটি দেশ। এটিকে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। আফগানিস্তানের পূর্ব ও দক্ষিণে অবস্থিত পাকিস্তান। পশ্চিমে ইরান। উত্তরে তুর্কেমিনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজাকিস্তান। আর এর উত্তর-পূর্বে গণচীন অবস্থিত। আফগানিস্তান একটি রুঢ় আবহাওয়ার দেশ। এর অধিকাংশ এলাকা পর্বত ও মরুভূমি দ্বারা আবৃত। উত্তর দিকে কিছু সমভূমি দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে কিছু গাছপালা রয়েছে। গ্রীষ্মকালে আফগানিস্তানের আবহাওয়া গরম থাকে। আর শীতকালে এখানে প্রচন্ড শীত পড়ে। আফগানিস্তান প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। অনেক প্রাচীন বাণিজ্য এবং বহিরাক্রমণ এ দেশের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু লোক আফগানিস্তানের মধ্য দিয়েই চলাচল করেছে। অনেক জাতি এখানে বসতি স্থাপন করেছে। এ দেশে বসবাসরত সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হলো পশতু জাতি। ৫০ হাজার বছর আগে থেকেই আফগানিস্তানে মানুষের বসতি ছিল। আফগানিস্তানকে অনেক জাতি শাসন করেছে মর্মে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আফগানিস্তান রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা ও সৈয়দ মুজতবা আলীর আব্দুর রহমানের দেশ হিসেবেও পরিচিত। সম্প্রতি তালেবানদের অগ্রযাত্রায় আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকার পতন হয়। ফলে বিশ্বমিডিয়ার সংবাদ মাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়ে পড়ে আফগানিস্তান। বিশ্ববাসীর মত বাংলাদেশীদের কাছেও আফগানিস্তানের হাড়ির খবর জানার আগ্রহ বেশ লক্ষণীয়। আফগানিস্তান একটি হতদরিদ্র সার্কভুক্ত দেশ। তবে এর রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আফগানিস্তানে জন্ম নেয়া নানা গোত্র বিভিন্ন কারণে বেশ প্রসিদ্ধ। মধ্যযুগে হিন্দুস্থানে শাসনকার্যে এসকল প্রসিদ্ধ গোত্রের মানুষেরা ব্যাপক অবদান রেখেছে। আধুনিক যুগে উপমহাদেশের রাজনীতিতেও তাদের নামের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাওয়া যায়। সিনেমা, সংগীত, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফগানিস্তানের অনেক খানেরা। জড়িয়ে আছে কাপুরেরা, আফ্রিদিরা এবং আরো অনেকে। এসব খান, কাপুর আর আফ্রিদিদের পূর্বপুরুষের শিকড় এই আফগানিস্তান। দূর অতীতের অভিবাসন প্রত্যাশীদের কাছে আফগানিস্তান ছিল একটি সরাইখানার মত। মরুময় ঝাঁঝালো আবহাওয়া ডিঙ্গিয়ে তারা আসতো সিন্ধু, পাঞ্জাব আর বাংলার উর্বর সবুজ ভূমির দিকে। পাহাড়-পর্বত, বন-বাদাড়ের চড়াই-উৎরাই মাড়িয়ে তাদের সাক্ষাত মিলতো গিরিপথের উপর দাঁড়ানো এক সরাইখানার সাথে। আর সে সরাইখানা হলো আফগানিস্তান। অভিবাসন প্রত্যাশীর সকলকেই এ সরাইখানার আতিথেয়তা কিংবা শত্রুতা গ্রহণ করতে হতো । দুটোর যেকোনো একটা গ্রহণ করেই তারপর সামনে এগুতে হতো। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে এখানে অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষজন আসতে শুরু করে। আফগানিস্তান শাসন ও দখলের নিমিত্তে অনেকেই সেখানে প্রবেশ করেছে। কিন্তু তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারে নাই। দখলদার ঔপনিবেশকরা পরাজিত হয়েছে। লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। অবশেষে আত্নসমর্পণের গ্লানি নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। দীর্ঘ পরিক্রমায় একের পর এক আফগানিস্তানের হাতবদল হয়েছে। দেশটি অতীতে পারস্য, গ্রীস, সেলুসিড, মৌযর্, আরব, মঙ্গল, খোয়ারিজম ও তিমুরীয় শাসকগণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পারস্য সাম্রাজ্য এই আফগানিস্তান দখল করে নেয়। তারা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে মহামতি আলেকজান্ডার পারস্য সম্রাটকে পরাজিত করে আফগানিস্তানের দখল নেয়। দখলে নিয়েই আলেকজান্ডার বলেছিলেন, আফগানরা ’অপরাজেয়’। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এশিয়ার কুশান জাতি আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। চতুর্থ শতাব্দীতে হুন নামের মধ্য এশিয় এক তুর্কি জাতি কুশান জাতিকে পরাজিত করে। সপ্তম শতাব্দীতে আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। আরব মুসলিমেরা পশ্চিমের হেরাত ও সিস্তান প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। দশম শতাব্দীতে উজবেকিস্তানের বুখারা থেকে একদল মুসলিম শাসক আফগান এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। একই সময়ে এখানে গজনবী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা হয়। গজনীর সর্বশেষ রাজা ছিলেন মাহমুদ গজনবী। তিনি ৯৯৮ সাল থেকে ১০৩০ সাল পর্যন্ত এই এলাকা শাসন করেন। তিনি প্রায় সকল হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে আফগানিস্তানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় আফগানিস্তান সাহিত্য ও শিল্প নগরীতে পরিণত হয়। মাহমুদ বুদ্ধিজীবীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার মধ্যে রয়েছে ইতিহাসবিদ আল-বিরুনী ও মহাকবি ফেরদৌসী। মাহমুদের মৃত্যুর পর গজনীর প্রভাব হ্রাস পায়। ১২০০ শতাব্দীতে পশ্চিম-মধ্য আফগানিস্তানে ঘুরি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২১৫ সালে খোয়ারিজমি শাহদের কাছে ঘুরি রাজ্যের পতন ঘটে। ১২১৯ সালে মঙ্গোল সেনাপতি চেঙ্গিস খান খোয়ারিজিমিদের পরাজিত করেন। ১৪০০ শতাব্দীতে তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করেন। ঘুরি থেকে তৈমুরীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে এখানে ইসলামী স্থাপত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। এ সময় তৈরি হয় মসজিদ, মাদ্রাসা, মিনার ও মাজার-ই-শরীফ। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা জহির উদ্দিন বাবর ১৫০৪ সালে কাবুল ও কান্দাহার দখল করে নেয়। ১৫২৬ সালে বাবর ভারতে আক্রমণ করেন। তিনি লোদী বংশকে পরাজিত করে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূনকে দিল্লির উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। আর অন্য তিন পুত্র কামরান মির্জা, আস্কার মির্জা ও হিন্দাল মির্জাকে কাবুল, কান্দাহার ও বদকশান শাসনের দায়িত্ব প্রদান করেন। মোগলদের সময়ে কাবুল, দিল্লি ও আগ্রা একই সূত্রে গ্রথিত ছিল। পরবর্তীতে ১৫৪৫ সালে বাবরের জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ুন কাবুল, কান্দাহার, গজনী ও বদকশানের একচ্ছত্র শাসক হন। দিল্লি থেকেই তখন আফগানিস্তানের প্রদেশগুলি মোগলদের দ্বারা শাসিত হতো।
১৭৪৭ সালে আবির্ভাব ঘটে আহমদ শাহ দুররানির। তিনি ছিলেন তেহরানের প্রতাপশালী সেনাপতি নাদির শাহের অনুগত এক সেনাধ্যক্ষ। কান্দাহার শহরকে রাজধানী করে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। কাবুল, কান্দাহার, হেরাত, গজনী ও পেশাওয়ার নিয়ে জন্ম হয় আধুনিক আফগানিস্তানের। তিনি আফগানিস্তানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। আর কালক্রমে এক শক্তিশালী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। তার মৃত্যুর পর পুত্র তৈমুর শাহ আফগানিস্তানের রাজধানী কান্দাহার থেকে কাবুলে স্থানান্তরিত করেন। ১৭৯৩ সালে তৈমুরের মৃত্যু হয়। অতঃপর তাঁর পুত্র জামান শাহ, মাহমুদ শাহ, সুজা শাহ ও অন্যান্যরা সিংহাসনে আরোহন করেন। এ সময়ে আফগানিস্তান নিয়ে সর্বপ্রথম বেপরোয়া নাক গলানো শুরু করে ব্রিটিশরা। তারা ১৮৩৯ সালে আফগানিস্তানে হামলা চালায়। ১৮৪২ সালে তারা আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তান আবার পরাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯১৪ সালে আফগানিস্তানের শাসক ছিলেন হাবিবুল্লাহ খান। ১৯১৯ সালে তুরস্কের অনুসারী বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। তার স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর পুত্র আমানুল্লাহ খান। তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। দীর্ঘ যুদ্ধে ইংরেজরা ক্লান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা পরাজয় বরণ করে। এসময় কাবুলে ব্রিটিশ সৈন্যসহ মোট ১৬০০০ ব্রিটিশ নাগরিক অবস্থান করছিল। আফগান যোদ্ধারা তাদেরকে খাইবার গিরিপথ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ব্রিটিশদের অতিরিক্ত নাক গলানোর কারণে এদের প্রায় সকলকেই আফগান যোদ্ধারা হত্যা করে। মাত্র একজন সৈনিকডাক্তার ঘোড়ার পিঠে ঝুলতে ঝুলতে তাদের ঘাঁটিতে ফিরে আসে। এটাও সম্ভব হয়েছিল আফগানদের ইচ্ছাতেই। কারণ তারা চেয়েছিল অন্তত একজন ব্রিটিশ যেন ফিরে গিয়ে তাদের করুণ পরিণতির কথা ব্রিটিশদের কাছে বলতে পারে। স্বাধীনচেতা আফগান শাসক আমানুল্লাহ ইংরেজদের ক্ষমতা খর্ব করেন। আফগানিস্তানকে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। ১৯২৯ সালে দেশে আবার অস্থিরতা নেমে আসে। ক্ষমতা দখল করেন হাবিবুল্লাহ কালাকানি নামে এক দস্যু সর্দার। ১৯৩০ সালে আফগানিস্তানের নতুন শাসক হন জহির শাহ। তিনি একটানা ৪০ বছর আফগানিস্তান শাসন করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক রাজতান্ত্রিক শাসন চলমান থাকে। ১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জহির শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। এতে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। প্রজাতন্ত্র হিসেবে আফগানিস্তানের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট তখন মোহাম্মদ দাউদ খান। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন বামপন্থী সামরিক নেতা নূর মোহাম্মদ তারাকি। অতঃপর ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেন পিপলস পার্টি ও ব্যানার পার্টি। এ সরকারের নাম দেয়া হয় বামপন্থী পিডিপিএ। এ সরকারের কোনো জনপ্রিয়তা ছিল না। এ সরকারটি ছিল সোভিয়েতের অনুগত তাবেদার বাহিনী। ব্রিটিশদের আদলে এসময় আফগানিস্তানে শুরু হয় সোভিয়েত রাশিয়ার আনাগোনা। তাদের অনুগত সরকারকে সমর্থন করার জন্য সোভিয়েত ইইনিয়ন আফগান জনগনের উপর চাপ সৃষ্টি করে। স্বাধীনচেতা আফগানরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে। তারা ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। তারা মাত্র ৬ মাস আফগানিস্তানে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা সেদেশে অবস্থান করেছিল দশ বছর। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ুযুদ্ধের ময়দান হয়ে উঠেছিল এই আফগানিস্তান। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধ শুরু হয়ে চলে দীর্ঘ ১০ বছর। এ যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয় লক্ষ লক্ষ আফগান নাগরিক। ২৮ লাখ আফগান পাকিস্তানে এবং ১৫ লাখ আফগান ইরানে আশ্রয় নেয়। এখনো প্রায় ২০ লাখেরও বেশি আফগান নাগরিক পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্কের শরণার্থী শিবিরে জীবনযাপন করছে। সহিংসতার কারণে যাদের অনেকেই দেশে ফেরার ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। সংঘটিত এ যুদ্ধে ধ্বংস হয় মূল্যবান স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। এসময় বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতি ও শহুরে গোষ্ঠীগুলো তাবেদার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। যাদের একটি গ্রæপকে বলা হতো আফগান মুজাহিদীন। আফগান মুজাহিদরা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা অব্যাহত রাখে। পিডিপিএ সরকারকে সব ধরণের সহযোগিতা দিতো সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর আফগান মুজাহিদদেরকে সহযোগিতা করতো যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশ। ক্রমাগত মুজাহিদ বাহিনী গেরিলা হামলা জোরদার করতে থাকে। সোভিয়েত বাহিনী ক্লান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। অত:পর তারা ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। (চলবে)
দৈনিক মানবকন্ঠ। ২৭ আগষ্ট ২০২১।